কুকুরের খামারে সফলতার গল্প

পশু-পাখির প্রতি ভালোবাসা থেকে বিদেশি প্রজাতির কুকুরের খামার গড়ে তুলেছেন দিনাজপুরের জাহিদ ইসলাম সোহাগ (৩০)। স্বল্প পরিসরে নিজ বাড়িতেই চার প্রজাতির ২০টি কুকুর নিয়ে খামার তৈরি করে এখন অনেকটাই স্বাবলম্বী তিনি।

দিনাজপুর সরকারি কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞান বিভাগে লেখাপড়া শেষ করেই ভিডিও এডিটিং ও ফটোশুটের কাজকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করলেও সোহাগ এখন কুকুর পালন করে একজন সফল কুকুর খামারি।

গত ৪ বছর আগে পড়াশোনা শেষ করে চাকরির পেছনে না ঘুরে দিনাজপুর জেলা সদরের উত্তর বালুবাড়ী মহল্লার তসলিম উদ্দিনের ছেলে জাহিদ ইসলাম সোহাগ কবুতরের খামার গড়ে তোলেন। ৮০ থেকে ৯০ জোড়া বিভিন্ন প্রজাতির কবুতর নিয়ে কবুতরের খামার গড়ে তোলেন তিনি।

কবুতরের খামারের পাশাপাশি জাপানি প্রজাতির একটা লাসা কুকুর ক্রয় করে পালন শুরু করেন তিনি। কিছুদিন পরেই জাপানিজ লাসা কুকুরের দুটি বাচ্চা জম্ম হয়। সেই লাসা কুকুরের বাচ্চা দুটির দাম প্রায় লাখ টাকা বিক্রি হয়। এরপর থেকেই কবুতরের খামার স্বল্প পরিসরে এনে অমেরিকান লাসা, জার্মান থেকে জার্মান শেফার্ড ও ইন্ডিয়া থেকেউলফ ডগ ক্রয় করে খামার গড়ে তোলা হয়। এখন তার খামারে ১৯টা বিভিন্ন প্রজাতির কুকুর রয়েছে।

একটি কুকুর ছানা ৩০ থেকে ৫৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। একটি বাচ্চাকে একটি নাম ধরে ডাকলে তাৎক্ষণিকভাবে সোহাগের কাছে চলে আসে। কুকুরগুলো ক্রিকেট বল দিয়ে খেলতে খুবই পছন্দ করে।

জাহিদ ইসলাম সোহাগ বলেন, গত ৪ বছর আগে কবুতরের খামারের পাশাপাশি বিভিন্ন পাখির খামার গড়ে তোলার পর অমেরিকান প্রজাতির কুকুর লাসা ক্রয় করি। এই লাসা কুকুরের নাম রাখা হয় ড্যানিয়েল। ড্যানিয়েল নাম ধরে ডাক দিলেই কাছে চলে আসে। ড্যানিয়েলকে কোলে নিয়ে আদর করতে হয়।

‘এরপর জার্মান থেকে জার্মান শেফার্ড এবং ইন্ডিয়া থেকে উলফ ডগ ক্রয় করে নিজ বাড়িতে লালন-পালন করতে থাকি। অমেরিকান লাসা ও জার্মান শেফার্ড বছরে দুইবার বাচ্চা দেয়। অমেরিকান লাসা কুকুর ৫ থেকে ৭টা পর্যন্ত বাচ্চা দেয়। আর জার্মন সেফার্ড ১০ থেকে ১৫টি পর্যন্ত বাচ্চা দেয়।’

জাহিদ ইসলাম সোহাগ আরও বলেন, কুকর ছানাদের বয়স ৪০ থেকে ৪৫ হলেই নাদুসনুদুস হয়ে যায়। এরপরই বিক্রির জন্য উপযুক্ত হয়ে যায়। এদের পেছনে প্রতিদিন ১শ’ থেকে ১৫০ টাকা খরচ হয়। কুকুর ছানাগুলোর এত চাহিদা যে জম্ম থেকেই ক্রেতারা অর্ডার দিয়ে থাকেন।

‘ডিফেন্সের লোকেরা, বিশেষ করে র‌্যাব, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর লোকদের কাছে জার্মান শেফার্ড কুকুরগুলোর চাহিদা বেশি থাকে। কারণ এই কুকুরগুলো অনুসন্ধান বা তদন্তমূলক কাজে ব্যবহার করা হয়। তাই ছোট থেকেই বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিয়ে জার্মান সেফার্ড কুকরের বাচ্চাগুলো ক্রয় করতে বেশি আগ্রহ দেখায়। এই বাচ্চাদের চাহিদা অনেক বেশি থাকে।’

তিনি আরও বলেন, এখন অনেক ব্যবসায়ী কুকুর পালনের প্রতি অনেকটাই বেশি উৎসাহিত। কুকুরছানা কেনার জন্য আগে থেকেই প্রস্তাব দিয়ে রাখে, যখন ওই কুকুরের ছানা জন্ম হয়। তার আগে থেকেই কুকুরের ছানা ক্রয় করার জন্য প্রস্তাব এবং অ্যাডভান্স পেমেন্ট করে থাকেন অনেকে।

কুকর খামারি সোহাগের স্ত্রী রিফাত জাহান রিমি জানান, ছোটবেলা থেকে আমারও পশু-পাখির প্রতি ভালোবাসা রয়েছে, বিশেষ করে দেশের বাইরের কুকুরগুলোর প্রতি ছোটবেলা থেকেই একটি দুর্বলতা ছিল। এখন আমার স্বামী বাণিজ্যিকভাবে কুকুরের খামার করছেন। কুকুরগুলোকে আমি নিজ হাতে খাবার তৈরি করে পরিবেশন করি।

তিনি বলেন, কুকুর ছানাদের আদর করি, অনেক ভালো লাগে। আমার স্বামীর অনুপস্থিতিতে এদের দেখাশোনা, গোসল করানোর কাজগুলো আমিও করি। একটা বিষয় হলো, কুকুরগুলো ঘরের মধ্যে কখনো টয়লেট করে না। যখন টয়লেটের চাপ হবে তখনই অনেক চেচামেচি করে। তখনই বুঝতে পারি যে টয়লেটের চাপ আসছে। ছেড়ে দেই, বাহিরে গিয়ে টয়লেট শেষ করে আবার ঘরে চলে আসে। সব মিলিয়ে কুকুরের বাচ্চাগুলোকে নিজ সন্তানের মতো লালন-পালন করি।

রিমির মা মাফরুহা পারভিন রিকতা বলেন, এখন আমার বাসাতেই জামাই-মেয়ে মিলে গড়ে তুলেছে কুকুরের খামার। কুকুরগুলো অত্যন্ত প্রভুভক্ত। কুকুরগুলো সকালবেলা ডিম সিদ্ধ, দুপুরে এবং রাতে খিচুড়ি-মাংস রান্না করে পরিবেশন করা হয়। আমার মেয়ে এবং মেয়ের জামাই দুজনেই কুকুরগুলোকে নিজের সন্তানের মতো আদর করে।

তিনি বলেন, ইসলামী ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে কুকুর পালনে বিধিনিষেধ রয়েছে। প্রথম প্রথম আমাদের একটু বিরক্ত লাগলেও এখন আর তেমন কিছু মনে হয় না। সব মিলিয়ে কুকুরগুলো আমাদের পরিবারের সদস্য হিসাবে মনে করি।

প্রতিবেশী এজাজ আহমেদ বলেন, আমাদের বাড়ির পাশে কুকুরের খামার ওঠায় আমরা অনেকটা নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারি, কারণ বিদেশি কুকুরগুলো অত্যন্ত সাহসী এবং তীক্ষ্ণ বুদ্ধি সম্পন্ন। আমাদের এলাকায় কোনো দুষ্কৃতিকারী প্রবেশ করতে পারে না। দুষ্ট প্রকৃতির লোক আমাদের গ্রামে আসলে এই কুকুরগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সাথে প্রতিহত করে। কুকরের খামারের কারণে আমরা অনেকটা নিরাপদ বসবাস করছি।

প্রতিবেশী রকি বলেন, সোহাগ ভাই বিদেশি প্রজাতির কুকুরের খামার গড়ে তুলেছেন এবং সেটা বাণিজ্যিকভাবে রূপ নিয়েছে। এখান থেকে প্রতিমাসে প্রায় দুই থেকে তিন লাখ টাকা আয় হয়, যেটা অন্য কোন সাধারণ পেশায় সম্ভব নয়। তাই আমিও মনে করি সোহাগ ভাই দেশের বাইরের কুকুর পালনে নুতন প্রজম্মকে এই পেশার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে। ভবিষ্যতেও আমারও কুকুরের খামার গড়ে তোলতে ইচ্ছে আছে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *